


এ কে এম মাজেদুল আলম ইভান, মাগুরা:
অধিকার, মর্যাদা, ভূমির নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের দাবি নিয়ে মাগুরায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সমাজের প্রান্তিক ও বিভিন্ন সময় বঞ্চনার শিকার হিসেবে চিহ্নিত এই জনগোষ্ঠীর এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের অধিকাংশের উপস্থিত না থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের মধ্যে দেখা দিয়েছে আক্ষেপ।
রোববার (৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় মাগুরা জেলা অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণ থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ র্যালিতে অংশ নেন। শহরের চৌরঙ্গী মোড় প্রদক্ষিণ শেষে র্যালিটি অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়।
পরে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মাগুরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সমন্বয় পরিষদের আয়োজনে এ কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতাকর্মী ও সদস্যরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মনোয়ার হোসেন খান এবং সভাপতির দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদের নাম নির্ধারিত ছিল। বিশেষ অতিথি হিসেবে জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আহমদ, মাগুরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম মেহেরুন্নাহারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতিগত কারণে তাদের অনেকেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
এ কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ ও সদস্যদের অনেকের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে হতাশা ও আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, যেসব জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ভূমি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক বৈষম্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে আসছে, তাদের নিয়ে আয়োজিত এমন গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হতো।
তবে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাগুরা পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মাসুদ হাসান খান কিজিল। তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি, সমস্যা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় তুলে ধরে তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা বৈষম্য, বঞ্চনা, ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ভূমির অধিকার সংরক্ষণ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কোনো একক সম্প্রদায়ের বিষয় নয় এটি মানবাধিকার, সাম্য ও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে জড়িত। বৈষম্য দূর করে মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
মাগুরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিশির রায় ও সাধারণ সম্পাদক সুবধ বাগদীসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পবিত্র গীতা পাঠ এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
দিবসটির কর্মসূচি ঘিরে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে এত বড় আয়োজনে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানের একটি আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অধিকার ও বঞ্চনার নানা প্রশ্ন নিয়ে যাদের কথা বলার জন্য এ আয়োজন, তাদের সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ থাকলে তা আরও অর্থবহ হয়ে উঠত—এমন প্রত্যাশাই ছিল অনেকের।